অন্যান্য

শিশুর বয়স উপযোগী খেলনাঃ কখন কি দিবেন?

একজন জানতে চাইলেন, ৩ মাসের বাচ্চাকে কি বই দেয়া যায়। সাথে সাথে একদল দাড়িয়ে গেলো, বাচ্চাকে কি পিএইচডি এখনই করাতে চান, আইনস্টাইন বানাবেন? এখনই বই দিয়ে বিদ্যান বানিয়ে ফেলবে যেন বাবুকে। আবার আরেকদল পাল্টা জবাব দিতে গেলো, তাহলে কি আপনাদের মতো ডিভাইসে আসক্ত করবো? বই দেননি বলেই তো বাচ্চারা মোবাইলে আসক্ত হয়েছে…..  ইত্যাদি ইত্যাদি।

কোনো তর্কে যাই না আর আজকাল। তারচেয়ে আসুন বিভিন্ন গবেষণা, শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা কি বলে এ ব্যাপারে! আসুন জানি কোন বয়সে আপনার বাচ্চাকে আসলে কি খেলনা দিবেন ওর বিকাশের জন্য ?

★০ থেকে ৬ মাসঃ

১ম ৩ মাস বাচ্চার দৃষ্টিশক্তি কিন্তু ঝাপসা থাকে, শুরুতে সবকিছু ডাবল দেখে। আস্তে আস্তে উজ্জল আলো, রঙিন বড় বড় জিনিস, মায়ের মুখ চিনতে শুরু করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আশেপাশের জিনিস চিনতে, হাত দিয়ে ধরতে ও মুখে দিতে চেষ্টা করে।

কি খেলনা দিবেন?

এসময় নরম, সহজে চ্যাপ্টা করা যায়, কোন ধারাল কোণা ছাড়া,  মুখে চিবানো যায় তবে মুখে যাওয়ার মতো কোনো ছোট দানাদার কিছু যেন না থাকে, সহজে পরিস্কার করা যায় এমন খেলনা দিবেন। ঝুন ঝুন করে শব্দ করে এমন খেলনাও খুব পছন্দ করে বাচ্চারা।

উজ্জ্বল রঙের বল, কাপড়ের পুতুল, ঝুনঝুনি, প্লাস্টিকের ছবি বা আয়না দিতে পারেন। ছড়া, গান, কবিতা গান শুনাতে পারেন হাত পা নেড়ে অভিনয় করে।

এসময় একটা করে ছবিওয়ালা বই  দেখাতে পারেন বাবুকে সাথো ছবি নিয়ে গান বা ছড়া কাটতে পারেন।

★৭ থেকে ১২ মাসঃ

এসময় একটু একটু করে নড়াচড়া শুরু করে বাচ্চারা, গড়িয়ে উপুর হওয়া, ধরে দাঁড়ানো, নিজের নাম ও শরীরের বিভিন্ন অংশ চিনতে পারাই এসময় তাদের কর্মচঞ্চলতার লক্ষণ।

কি খেলনা দিবেন?

বল, পুতুল, গাড়ী, বড় কিউব বা লেগো, কাগজ, বোতলের মধ্যে মুড়ি ভরা, শব্দ করে এমন খেলনা বা বাদ্যযন্ত্র। গল্পের বই থেকে ছোট ছোট গল্প, ছড়া, ছবি দেখানো। বই হাতে নিলো, কাগজ ছিড়লো, মুখে দিলো, ছবি দেখে চেনার চেষ্টা করানো এটুকুই হতে পারে তার বিমোদন।

★১ বছর থেকে ২ বছরঃ

শুরু হলো গতিময় জীবন। ধরে ধরে হাটতে শেখা, আস্তে আস্তে হাটা, সিড়ি বেয়ে উঠা, কিছু ছুড়ে দেয়া, লুকিয়ে রাখলে খুঁজে বের করতে চাওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে বাচ্চারা।

কি খেলনা দিবেন?

এসময় বল, কাপড় বা প্লাস্টিকের পুতুল বা জীবজন্তু, মিউজিকাল সেট, লেগো, চার বা ছয় পিসের পাজল সেট, মোমের রং পেন্সিল, কাগজ ও পেন্সিল দাগাদাগি করার জন্য।

★২ থেকে ৩ বছরঃ

এসময় দৌড় ঝাপের পাশাপাশি এরা আঙ্গুলের সুক্ষ ব্যবহারগুলোও শেখে এমনকি চিমটি দেয়াও। দক্ষতা ও কাজের পরিধি বাড়ানোর জন্য এসময় তাদের বিভিন্ন পাজল, লেগো দিয়ে ঘর বানানো, কিচেন সেট, কনস্ট্রাকশন সেট যেমন, হাতুড়ি বাটালি, ভোঁতা কেচি এসব দিয়ে নতুন কিছু তৈরী করা, ঘর সাজানো, বড়দের নকল করতে ডাক্তারি সেট, ইঞ্জিনিয়ার সেট, শপিংমল, কিচেন সেট, বারবি পুতুলের ঘর এসব দেয়া যেতে পারে। এমনকি হাঁড়িপাতিল, টিসেট, তিনচাকার সাইকেল, খেলনা গাড়ি, বাদ্যযন্ত্র বাচ্চাদের উপযোগী দেয়া যায়।

এসময়টাই বর্ণ চেনানোর উপযুক্ত সময়। বিশেষ করে এবিসিডি উচ্চারণসহ পিয়ানো, স্লেট, বই পাওয়া যায়। এসব কানে শুনে ও চোখে দেখে পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ে।

★৪ থেকে ৫ বছরঃ

পড়ালেখা শেখার সময় এখন থেকে শুরু। এসময় এদের জানার আগ্রহ থাকে প্রচুর। কি কেন কিভাবে সারাক্ষণ যেন প্রশ্নের খৈ ফুটে। নতুন কিছু শেখার আগ্রহ ও অন্য বাচ্চাদের খেলার আগ্রহ  এসময় তাদের বন্ধু তৈরি ও শেয়ার করা শেখায়।

কি খেলনা দিবেন?

শিক্ষামূলক হলে ভালো হয় যেমন বর্ণমালা দিয়ে তৈরি বড়, কিউব, পাজল, আর্ট এন ক্রাফট, বিভিন্ন জিনিস তৈরী যেমন তুলো দিয়ে মেঘ, কাটা সবজি বা চাল দিয়ে ফুল পাতা ঘর, রঙ করা ও ছবি আঁকার বই, বিদ্যুৎচালিত খেলনা, সুপার হিরোদের পুতুল, জামাকাপড়, আসবাবপত্রসহ খেলনা ঘর, ট্রেন, এরোপ্লেন, নৌকা, রং করার সামগ্রী।

এসব তাদের বর্ণমালা বলতে ও লিখতে শেখার অভ্যাস করানো যায়।

★৬ থেকে ৭ বছরঃ

এসময় একা একা নয়, দল বেধে খেলতে আগ্রহী হয় বাচ্চারা। একসাথে ঘরে বসে দাবা, লুডু, ক্যারাম বা মনোপলি খেলতে আগ্রহ বোধ করে। এছাড়া কম্পিউটার, মোবাইল বিভিন্ন ডিভাইসের প্রতি আগ্রহ  ও তা সহজে আয়ত্ত করার দক্ষতা অর্জন করে ফেলে।

বিভিন্ন স্পোর্টসে আগ্রহী করার জন্য ব্যাট বল, টেনিস ব্যাট, ব্যাডমিন্টন এসব দিয়ে খেলতে দেয়া যায়।

★৮ বছর বা এর উর্ধ্বে

এই বয়সে বাইরের খেলাগুলোতেই বেশী উৎসাহিত হয় বাচ্চারা। বিভিন্ন সায়েন্টফিক গেইম সেট দিয়ে বাচ্চাদের উৎসাহ দেয়া যায় জ্ঞান চর্চার জন্য।

বাচ্চাদেরকে কিভাবে গড়ে তুলবেন তার মুল চালিকাশক্তি আপনার হাতে রাখবেন। জিদকে প্রশ্রয় দিবেন না, বাচ্চার সামনে নিজেকে রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরুন। ভালো কিছু পেতে হলে তার জন্য অবশ্যই আপনাকে ভালো সময় দিতে হবে, পৃথিবীরতে কোনকিছুই বিনা পরিশ্রমে বা চাইলেই পাওয়া যায়, এমন নয়।

ডাঃ লুনা পারভীন
শিশু বিশেষজ্ঞ, বহির্বিভাগ
ঢাকা শিশু হাসপাতাল
শ্যামলি।

Facebook Comments

Related Articles

Back to top button